আড়ং নিয়ে কিছু বিরক্তি ও আক্ষেপের কথা এবং স্ট্যাটাস রিভিউ #2

স্ট্যাটাস :

//শেরাটন হোটেলে ছা-ছপ-সিঙ্গারা দশ টাকা না হয়ে দুইশ টাকা এই কারনে কত টাকা ফাইন হওয়া উচিৎ ফ্রান্স? গুলশান বনানীর পিজ্জা কেন হাজার টাকা — প্রধানমন্ত্রী জবাব চাই। একটা ভাল স্টেক খাইতে গেলে দুই হাজার টাকা লাগে। ভোক্তা আইন তুমি কুথায়?
কোন প্রতিষ্টান অযৌক্তিক দাম বাড়ালে ভোক্তারা অন্য যায়গা থেকে কিনবে, তারা ক্রেতা হারাবে। সেটাই স্বাভাবিক। প্রকান্তরে নিজের পায়ে কুড়াল মারার অধিকার সবার থাকা উচিৎ।//

উৎস :

উক্ত স্ট্যাটাসটি হোরাস সাবের ওয়াল থেকে নেয়া।

প্রসঙ্গ :

ওখানে হোরাস সাবের সাথে কয়েকটি কমেন্ট চালাচালি হচ্ছিল।
আমার প্রথম কমেন্ট : //এক দাম নাকি কাস্টমার বেশি হইলে দাম বাইড়া যায়?//

উত্তরে হোরাস সাব : //যে কোন সময় মেনুর দাম পরিবর্তন করার অধিকার তাদের আছে বলেই আমার বিশ্বাস।//

পাল্লা : //বাংলাদেশটা এখনো ইউরোপ-আমেরিকা হইয়া যায় নাই–বাংলাদেশের কুনো ব্যাপারে ইউরোপ-আমেরিকার উদারহণ দেয়া বুকামী।
তো দেশটা যখন ব্যবসায়ীদের, মানে তারাই যখন চালায়, তখন তারা যেমনে চালাবে, ইচ্ছাখুশি জিনিসপত্রের দাম বাড়াবে–সেইটাই স্বাভাবিক। তাই হুট কইরা কোনো কিছুর দাম বাইড়া গেলে শুধু বুদাইরাই কিছু না বুইঝা হাউকাউ করে। আবার ধরেন চাউলের দাম বাড়ে, কিন্তু ধানের দাম কেন বাড়ে না–এই প্রশ্নও যারা করে তারা আরো বড় বুদাই।//

হোরাস : //আপনি সেই দলে যোগ দিচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্রের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন আছে। সেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা অবশ্যই নেবে। শেরাটনে মাংসের প্লেটের দাম নিয়ে জন্যে হাউ কাউ হয়না কেন বলেনতো? সেটাওতো মাংসই নাকী? কারন শেরাটন সবাইকে এক্সেস দিতে বাধ্য না। এর সাথে দেশ বিদেশ বলে কোন কথা নাই।//

পাল্লা : //আড়ং ইস্যুতে এই প্রথম কমেন্ট। এক কমেন্টেই যদি পক্ষে বিপক্ষে ফেলাইয়া দেন, দিতে পারেন। ব্যাপার না।
আপনে শেরাটন হোটেলের উদাহরণ দিছেন। তবে বলেন তো–যে ছা-ছপ-সিঙ্গারার দাম শেরাটনে দুইশ টাকা টাকা, চাহিদা বাইড়া গেলে তারা হুট কইরা দামটা কয়েকগুণ বাড়াইবে কিনা?//

এই কমেন্টটির পরে লগআউট করে ঘুমাতে যাই। শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম আড়ং কথাটির উল্লেখ করে ধরা খাইলাম কি না, কারণ হোরাস সাব পোস্টে আড়ং কথাটির উল্লেখ করেন নি। তাই সহজেই উনি আমাকে চেপে ধরতে পারতেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি–না, উনি ওদিকে না গিয়ে এই কমেন্টটি করেছেন–

//জানি না। তবে বাড়াতে চাইলে সেটা তারা করতেই পারে। আমরা শেরাটনে খাইলাম না।//

তার মানে উনার পোস্টটা যে আড়ং ইস্যুতেই–সেটা নিশ্চিত হলাম। এছাড়া ওখানে আরো অনেকে আড়ং-এর পক্ষে-বিপক্ষে কমেন্ট করেছেন, উনি প্রতিবাদ করেন নি। এছাড়া তিনি নিজেই অরুপ কুমার বড়ুয়ার একটি কমেন্টের উত্তর দিয়েছে এভাবে–

//মাছ মাংসের দাম বাড়ানোর জন্যে কয়জনের ফাইন হয়েছে তার একটা তালিকা দিতে পারবেন? নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন আছে। সেই আইন অনুযায়ী দরকার হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। আড়ঙের কোন পাঞ্জাবী না কিনলে আপক্নার (আপনার) কিছুই আসবে যাবে কারন এটা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য নয়।//

এই হলো প্রসঙ্গ। এবার বিশ্লেষণে যাই–

বিশ্লেষণ :

হোরাস সাবের স্ট্যাটাসটি যে যৌক্তিক, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর সে কারণেই পোস্টের বিপক্ষে না গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম–শেরাটন হোটেল বা গুলশান-বনানীর খাবারের দোকানের দাম পূর্ব নির্ধারিত, নাকি কাস্টমার কমবেশি হলে ওখানের খাবারের দাম কমে বা বাড়ে।

তো ভোক্তা আইনে ঠিক কী বলা আছে, আমার জানা নেই। তবে অরুপ কুমার বড়ুয়াকে করা উনার মন্তব্যে উনি বলতে চাইছেন যে খাদ্য আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস হলেও বস্ত্র আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নয়। তাই খাদ্যের দাম বাড়লে সমস্যা হতে পারে, কিন্তু বস্ত্রের দাম বাড়লে সমস্যা নয়–আসলেই কি তাই? তবে //কোন প্রতিষ্টান অযৌক্তিক দাম বাড়ালে ভোক্তারা অন্য যায়গা থেকে কিনবে, তারা ক্রেতা হারাবে। সেটাই স্বাভাবিক। প্রকান্তরে নিজের পায়ে কুড়াল মারার অধিকার সবার থাকা উচিৎ।//–উনার এ কথাটিও অত্যন্ত যৌক্তিক। এখানে উনি আড়ং-এর কাপড়ের দাম বাড়ানোর ব্যাপারটায় যে বিরক্ত–সেটা স্পষ্ট।

এবার আমার বিরক্ত এবং হতাশার জায়গাগুলোর কথা বলতে চাই। তার আগে প্রাসঙ্গিক/অপ্রাসঙ্গিক কিছু কথা–

এক দামে কিছু কেনার অভিজ্ঞতা বাটার স্যান্ডেল। তখন গ্রে-কালারের বাটার স্যান্ডেল–দাম ৩০-৩৫ টাকার মধ্যে ছিল। প্রায় একই ডিজাইনের অন্য কোম্পানির স্যান্ডেল পাওয়া যেত ১৫-২০ টাকায়। কিছুদিন পরেই ফিতা ছিঁড়ে যেত। নতুন ফিতা কিনতে পাওয়া যেত–১-২ টাকায়। নয়তো আগুনে পুড়িয়ে বা গুনা বা ছোট পিন মেরে জোড়া লাগাতে হতো। এগুলোর তুলনায় বাটার স্যান্ডেল দাম অনেকটা বেশি হলেও টেকসই ছিল খুব। এমনও হয়েছে যে স্যান্ডেল ক্ষয়ে গেছে কিন্তু ফিতা ছিঁড়ে নি।

তখন একবেলা কিষাণ দিলে ২০ টাকা পাইতাম। সেখানে ৩০-৩৫ টাকা দিয়ে স্যান্ডেল কেনাটা বিলাসিতার পর্যায়েই পড়ত। তবে বাড়িতে বা গ্রামের মধ্যে তো আমরা খালি-পায়েই থাকতাম বেশি। গ্রামের বাইরে গেলে তবেই স্যান্ডেল পরতাম। আর কী যত্ন করেই না রাখতাম স্যান্ডেল জোড়া!

সেবারে ঢাকায় ছিলাম। হাতে কিছু টাকা ছিল। বিশুকে বললাম ভালো এক জোড়া জুতা বা স্যান্ডেল কিনব। সে নিয়ে গেলে এলিফ্যান্ট রোডের বাটার দোকানে। তখন সবে নতুন ডিজাইনের এক ধরনের স্যান্ডেল আসছে। পছন্দ হলো। কিন্তু দাম ৬০০ টাকা। ঘাবড়ে গেলাম। বিশু বলল, তাহলে চল অন্য দোকানে দেখি…। সারি সারি জুতা-স্যান্ডেলের দোকান, দেখলেই চোখ ঘুরে যায়। গেলাম। পছন্দ হলো। দাম চাইল ২৪০০ টাকা! দাম শুনে এমন অস্বস্তি লাগছিল মনে হচ্ছিল পালাতে পারলে বাঁচি। এর পরের কাহিনি আরো ভয়ঙ্কর–বিশু বলল–দেড়শ পর্যন্ত দিতে পারি, দেবেন? আমি বিশুর দিকে তাকিয়ে হা হয়ে গেলাম–কয় কী! ওদিকে লজ্জায় দোকানদারের দিকে তাকাতে পারছি না। বিশু বলল, চল যাই… দোকানদার পিছন থেকে বললেন–দুই হাজার হলে নিতে পারেন। বিশু বলল–দুইশ। এরকম দামাদামি করে শেষে বোধহয় তিনশ বা সাড়ে তিনশতে কেনা হয়েছিল।

মনে করলাম অনেক টাকা বাঁচলো। তখন বললাম, চল দেখি ভালো জামা বা পাঞ্জাবি পাওয়া যায় কি না। সায়েন্স ল্যাব মোড়ের দিকে নিয়ে গেলো। প্রচুর জামা-কাপড়ের দোকান। কিন্তু দরাদরি করতে করতে বিরক্ত। শেষে গিয়ে ঢুকলাম ক্যাটস আই’এর দোকানে। এক দাম। মনে হয় দুইটা শার্ট কিনেছিলাম।

পকেটে কিছু টাকা থাকলে দামাদামি করতে মন চায় না। একদামে কিছু কিনতে পারলেই ভালো লাগে। ঘুরে ঘুরে জিনিস দেখব, পছন্দ হলে দাম দেখব, পোষালে কিনব, নয়তো না। কিন্তু ওই দামাদামি করতে গিয়ে অহেতুক অনেক কথা বলতে হয়, অনেক সময় অনেক আপত্তিকর কথা শুনতেও হয়–একটা পর্যায় পরে আর ওসব শুনতে ভালো লাগে না।

তো এক দামে কেনাকাটা শিখে গেলে পরে আড়ং-এও গেছি–লালমাটিয়া। ১৫০ টাকা করে দুইটা টি-শার্ট কিনলাম। বেশি পছন্দ হয়েছিল সালোয়ার-কামিজ! কী সুন্দর কাজ করা! কিন্তু দেয়ার মতো কেউ ছিল না। চার তলাতে ক্যাফে। বিশু বলল, কফি খাওয়া। গেলাম। ১টাকায় সিঙ্গারা, ২টাকায় পুরি, ৫টাকায় ডিম-পরোটা খাওয়ার অভ্যাস। আঙং-এর কফি ৫০টাকা! দেখে বললাম, আমার তো কফি খাওয়ার অভ্যাস নাই, তুই একাই খা… আমি কিছু খাবো না। এর পরে ফার্মগেটে থাকাকালীন সময়ে প্রায় বিকেলেই সংসদ ভবনের দিকে যেতাম… মাঝে মাঝে আড়ং-এও গেছি, কিছু কিনতে না–ওই সালোয়ার কামিজগুলা দেখতে। ফিরে এসে দুইটাকার বাদাম কিনে সংসদ ভবনের মাঠে ঘাসের উপর শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতাম আর বাদাম চিবাতাম।

এর অনেককাল পরে আমেরিকা আসছি–তাও প্রায় বছর পাঁচেক হয়ে গেলো। মাঝে মাঝে টুকটাক জামাকাপড় কেনাকাটা করা লাগে। যাই, দেখি, দামটা দেখি। বেশি হলে ফিরে আসি। অপেক্ষা করি। কিছুদিন পরে এমনিতেই বা কোনো উপলক্ষে সেল দেবে–তখন কিনব। মজার ব্যাপার হলো–এসব ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতে প্রথমে যে দাম সেট করা হয় সেটা কখনো বাড়ে না, বরং কমে। আমাদের দেশের ঈদ-পূজার মতো এখানকার উপলক্ষে ওসব জিনিস অনেক কম দামে পাওয়া যায়। বা যখন নতুন ডিজাইন আসবে, তখন পুরানোগুলো অল্প দামে বিক্রি করে দেয়। যদিও অনেক বাঙালের ধারণা–ওসব দোকানে একশ ডলারের জিনিস ২০০ ডলার করে, তারপর ৫০% সেল দিয়ে কাস্টমার আকৃষ্ট করে সেই ১০০ ডলারেই বিক্রি করে। হাস্যকর পর্যবেক্ষন। রেস্টুরেন্টে যখন খাবার ডেলিভারির কাজ করতাম, তখন খাবার নিয়ে হেঁটে হেঁটে এখানে সেখানে যেতে হতো। ফেরার পথে ওসব মাঝে মাঝে ওসব দোকানে ঢুঁ মারতাম। বলাই বাহুল্য–আগে দেখতাম দাম।

তো বাংলাদেশে ছিল ওই বাটা। গর্ব করার মতো। পরে জেনেছিলাম, ওটা আসলে বাংলাদেশি কোম্পানি না, বিদেশি। তখন বলতাম– ক্যাটস্‌ আই, আরং তো আছে। ক্যাটস্‌ আই-এর কথা এখন জানি না। কয়েকদিন ধরে আড়ং নিয়ে কথা হচ্ছে, এই যে ঈদের সময় উৎপাদন না বাড়িয়ে দাম বাড়ানোর মতো নিচু কাজ করে এতো সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে–যা দেখলাম-বুঝলাম–এতোদিনেও আঙং একটা ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে উঠতে পারে নি। এটাই বিরক্ত আর আক্ষেপের কথা।

[ঈদের জামা পুড়িয়ে আড়ং বর্জনের ছবি ফেসবুক থেকে নেয়া।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *