বিয়ে প্রথা নিয়ে কিছু কথা

gultekin-khan

“কেউ ধর্মকর্ম কইরা ভালো থাকলে আপনের সমস্যা কী?”–এটা মডারেট আস্তিকদের কথা। উগ্র নাস্তিকদের ধর্ম নিয়া তীব্র সমালোচনার উত্তরে সব যুক্তি হারিয়ে ফেললে তখন মিনমিন কইরা এই কথাটা বইলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর বিদায় নেয়ার আগে যারা নাস্তিকদের কোতল করে, মনে মনে তাদেরকে শুক্রিয়া জানায়।

আস্তিকদের কথা বইলা লাভ নাই। যারা ধর্ম কী কেন কবে কীভাবে–এসব জানেন তাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না যে আস্তিকদের মন-মানসিকতা একটা লেভেল পর্যন্ত কেন সীমাবদ্ধ। কিন্তু নাস্তিকদের মন-মানসিকতা কেমন?

বিয়া নামক প্রথাটার কথা ধরা যাক। বিয়া জিনিসটা কী কেন কবে কীভাবে–এসব যারা জানেন না, তারাও আস্তিকদের ওই যুক্তিটার মতো কইরা বলতে পারেন–“কেউ বিয়াশাদী কইরা ভালো থাকলে আপনের সমস্যা কী?”–অবাক হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু যারা জানেন, তারাও এই প্রশ্ন করলে অবাক হইতে হয় বৈকি।

এর পরে অবশ্য আরো অনেক লেভেল আছে। ধরেন যারা পুঁজিবাদের সমর্থক, তারাও সঙ্গত কারণেই বিয়ে প্রথার সমর্থক হইতে পারে। অবাক হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু যারা সাম্যের কথা বলে, তারাও যখন বিয়ের পক্ষে কথা বলে, তখন অবাক না হইয়া উপায় থাকে না।

এর আগে অবশ্য নারীবাদীদের কথাও বলতে হয়। তারা নারী-পুরুষের সাম্য ও সমান অধিকারের কথা বলেন। কিন্তু বিয়ে জিনিসটা কী কেন কবে কীভাবে–এসব জানার পরেও তারা কীভাবে বিয়ে জিনিসটাকে সমর্থন করেন, বুঝে আসে না। বিয়ে–স্বামী-স্ত্রী–তারা কি এই “স্বামী” শব্দটার অর্থ জেনেও বিয়ে প্রথা সমর্থন করেন?

তেনাদের আরো কিছু যুক্তি আছে–দেশটা এখনো ইউরোপ-আমেরিকা হইয়া যায় নাই, তাই এই নিয়া কথা বলা যাবে না, সেই নিয়া কথা বলা যাবে না…
এই সব যুক্ত দেয়ার সময়েও অনেকে ভুলে যায় যে–প্রেক্ষাপট বিচার করে কথা বলা লাগলে প্রচলিত সমাজের কোনো কিছু নিয়াই কথা বলা যায় না, আর ব্যাপারটা তো ভোট বা লাইকের রাজনীতি না যে সব লেখককে ভোটার বা লাইকারদের মন জুগিয়ে লিখতে হবে…

বোনাস : কেউ লুটপাত থুক্কু লীগ কইরা ভালো থাকলে আপনের সমস্যা কী?

২) কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ–হুয়ায়ুন আজাদের প্রসঙ্গ আসলেই আমার এই বইটার কথা সবার আগে মনে আসে। উনাকে বলা হয় ‘প্রথাবিরোধী লেখক’। ভাগ্যিস হুয়ায়ুন আজাদের লেখালেখিগুলোর মধ্যে ওই বইটা একেবারে গোড়ার দিকে পড়া থাকাতে ‘প্রথাবিরোধী লেখক’ বলার মানে বুঝতে সমস্যা হইত না।

হুয়ায়ুন আজাদ ‘প্রথাবিরোধী লেখক’ হতে পারেন, কিন্তু তিনি কি ‘প্রথাবিরোধী মানুষ’ ছিলেন? উনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা নেই, বা উনার ‘আত্মজীবনী’ আছে কিনা–জানা নেই, বা থাকলেও পড়া হয় নি। তবে অনন্য আজাদের সূত্রে জানি যে বাস্তবে হুয়ায়ুন আজাদ বিয়ে নাম প্রথাটা এড়িয়ে যেতে পারেন নি। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ভাবে আমি নিজেও বিয়ে প্রথার বিরোধিতা করলেও বাস্তব জীবনে একাধিক বার বিবাহিত। এমনও তো হতে পারে যে, ধর্মীয়-সামাজিক রীতিতে বিয়ে করার পরেই অনেকে বুঝতে পারেন যে বিয়ে প্রথাটা বাতিল হওয়াই উচিত। বা সমাজটা চিরদিন একভাবে যাবে না, পরিবর্তন আসবে, বিয়ে প্রথাটাও বাতিল হবে…

৩) গুলতেকিন খানের দ্বিতীয় বিয়েটা অবশ্যই আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে একটা বড় ‘স্টেপ’। কিন্তু একই সাথে লেখিকা তসলিমা নাসরিন একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, “তার মানে কিন্তু মেয়ে- মহিলারা যা ইচ্ছা তাই করনের সুযোগ পাইয়া গেসে তা না। পাইয়া গেসে ভাইব্যা সুখ পাওয়ার কিছু নাই।”–যদি এই কথার বিরোধিতা কইরা কেউ মনে করেন যে এই বিয়েতেই “নারীমুক্তি” ঘইটা গেছে, হাইস্যকর হইবে না?

তবে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হইতেছে তসলিমা নাসরিনের সেই স্ট্যাটাসের লাস্ট প্যারাটা নিয়া–//বিয়া করাডার নাম নারী স্বাধীনতা না। বরং উল্ডা। বিয়া না কইরা, ত্যাগ না কইরা, মাইনষের করুনার পাত্রী না হইয়া, পরনির্ভর না হইয়া, মাথা উচা কইরা বাচার নাম নারী স্বাধীনতা। ভুইলা গেলে চলবে না বিয়া জিনিস্টাই নারী বিরোধী।//–নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি বলা হয় নারীর স্বাবলম্বিতার ব্যাপারে। তারপর একটা বড় প্রশ্ন–নারী যদি স্বাবলম্বী হইয়াই যায়, তাইলে তার আর বিয়ার করার দরকার কী?

যা হোক, স্বাবলম্বী হওয়ার পরেও কেউ যদি বিয়া কইরা ভালো থাকে, থাকুক। আসলেই কারো কিছু বলার নাই। তার মানে আবার এই-ও না যে বিয়া প্রথার বিপক্ষে কেউ কিছু বলতে পারবে না। আপনি বিয়া কইরা সুখে আছেন–কেউ আপনারে খোঁচাইতেছে না যে আপনি বিয়া কইরা কেন সুখে আছেন। ধর্ম নিয়া কথা যখন ওঠে তখন সামগ্রিক ভাবে ধর্ম নিয়াই কথা ওঠে। আর উদাহরণ হিসাবে ধার্মিকদের কর্মকাণ্ড উঠে আসে, তেমনি বিয়া প্রথা নিয়াও একই ব্যাপার।

অনেকে অবশ্য লেখকের “ভাষা” নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। একজন লেখকের ভাষার স্বাধীনতাও থাকতে পারবে না? হায় ব্যক্তিস্বাধীনতা-বাকস্বাধীনতার স্বপক্ষের যুক্তি! একজন লেখক কখন কেন কোন ভাষায় লিখবে সেইটাও আপনারা শিখায়া দিবেন?

আরো অনেকরে বলতে দেখলাম–তসলিমা নাসরিন ৩-৫টা বিয়া (উইকি থিকা বা শোনা কথা থিকা পাইছেন, তাই না?) কইরা নাকি বুঝতে পারছেন যে বিয়া খারাপ। বাংলাদেশে খুব সম্ভবত তখন পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম আর একটা পুরানা বৃটিশ আইন মতে বিয়ার নিয়ম আছিল। কেউ কি বলতে পারবেন, আপনারা যেগুলারে বিয়া বলতেছেন, সেই বিয়াগুলা কী মতে হইছিল? (পিনাকী ভট্টাচার্যর বিয়াটা কোন মতে হইছে–এইটা অনলাইনে এইটারে আমরা একটা ‘ভ্যালিড টপিক’ হিসাবে খাঁড়া করতে সমর্থ হইছি–ধরেন প্রশ্নটা সেই হিসাবেই করলাম।)

৪) আস্তিকদের মতো নাস্তিক-প্রগতিশীলরাও যখন ব্যক্তিগত বিশ্বাস আবেগ অনুভূতি রাগ হিংসা বিদ্বেষ পছন্দ অপছন্দ লোভ স্বার্থ থিকা কোনো কিছুর সমালোচনা করে তখন
তপু স্যারের সৌজন্যে সেই পুরানো কথাটা আবার মনে করিয়ে দেই :
বিশ্বাস-আবেগ-অনুভূতি… < যুক্তি-তর্ক < তথ্য-প্রমাণ < সত্য

৫) সংযোজন :

সাম্যবাদের কথা বলা কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে বিয়ে নিয়ে কিছু কথা আছে, তুলে দিতেছি–

“বুর্জোয়া বিবাহ হল আসলে অনেকে মিলে সাধারণ স্ত্রী রাখার ব্যবস্থা। সুতরাং কমিউনিস্টদের বিরদ্ধে বড় জোর এই বলে অভিযোগ আনা সম্ভব যে ভন্ডামির আড়ালে মেয়েদের উপর সাধারণ যে অধিকার লুকানো রয়েছে সেটাকে এরা প্রকাশ্য আইনসম্মত রূপে দিতে চায়। এটুকু ছাড়া একথা স্বতঃসিদ্ধ যে আধুনিক উৎপাদন-পদ্ধতি লোপের সঙ্গে সঙ্গে সেই পদ্ধতি থেকে উদ্ভূত মেয়েদের উপর সাধারণ অধিকারেরও অবসান আসবে, অর্থাৎ প্রকাশ্য ও গোপন দুই ধরনের বেশ্যাবৃত্তিই শেষ হয়ে যাবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *