তুমি মোর জীবনের সাধনা

তুমি জানো না রে প্রিয়, তুমি মোর জীবনের সাধনা

আরবি শব্দ ‘ফানা’ বাংলায় বিলীন হওয়া বা মিশে একাকার হয়ে যাওয়া বুঝায়। ইসলাম ধর্মীয় অর্থে ফানা বলতে নিজের আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর সাথে মিশে একাকার হয়ে যাওয়াকে বুঝায়।

আল্লা সাধনায় ফানা ফিল্লাহর ৩ টি স্তর রয়েছে–১) সাধারন ফানা ফিল্লাহ ২) আদর্শ ফানা ফিল্লাহ, এবং ৩) মোকাম্মেল ফানা ফিল্লাহ।

ফাআইনামা-তুওয়াল্লূ ফাছাম্মা ওয়াজহুল্লা-হি… যেদিকেই তোমরা মুখ ফিরাও না কেন, সেদিকেই আল্লাহর চেহারা বিদ্যমান রয়েছে। [সূরা বাকারাহ : ১১৫]
এই সূরায় সাধনার দ্বিতীয় স্তরের কথা বলে হয়েছে। সাধারন ফানা ফিল্লাহ নামক সাধনার প্রথম ধাপ থেকে এই ধাপে সাধকের আদর্শ ফানা ফিল্লাহ হাসিল হয়। এ অবস্থায় সাধক যেদিকে তাকায় সেদিকেই আল্লাহর চেহারা দেখতে পায়।

“সর্ব্বত্র কৃষ্ণের রূপ করে ঝলমল।
সে দেখিতে পায় যার আঁখি নিরমল।।”–চৈতন্যদেব
–অর্থাৎ সাধক যে দিকেই তাকায়, সেদিকেই আল্লাহর চেহারা বিদ্যমান রয়েছে।

চণ্ডীদাস কহেন–
“ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছয়ে যে জন,
কেহ না জানয়ে তারে,
প্রেমের আরতি যে জন জানয়ে,
সেই সে চিনিতে পারে।”

আর চণ্ডীদাসের শ্রীরাধিকা আল্লাহ সাধনার এই স্তরে এসে পুলকে আকুল, কারণ–
“পুলকে আকুল, দিক্‌ নেহারিতে, সব শ্যামময় দেখি।” (চণ্ডীদাস)
–অর্থাৎ রাধা যেদিকে তাকায়, সেদিকেই আল্লাহর প্রকাশ দেখে পুলকে তার চিত্ত ভরে যায়।

শুধু যে দেখে, তা নয়, সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব অনুভব করে–
“ধিক্‌ রহ এ ছাড় ইন্দ্রিয় আদি সব।
সদা সে কালিয়া কানু হয় অনুভব।।”–চণ্ডীদাস

সাধক রামকৃষ্ণও সমস্ত জীবের মধ্যে আল্লাহকে দেখতে পেয়ে বলেছিলেন–“যত জীব তত শিব।”
তেনার শিষ্য শ্রীযুক্ত বিবেকানন্দও গুরুর দেখানো পথে আল্লাহর সন্ধান পেয়েছিলেন। আর তাই তো বলে গেছেন–“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”

প্রেমও এক ধরনের সাধনা। আর সেই সাধনার এই স্তরে এসে প্রেমিক-প্রেমিকারাও যেদিকে তাকায়, সেদিকেই একে-অন্যকে দেখতে পায়–
“তোমার আগে আর কেউ নেই
তোমার পরেও আর কেউ নেই
যেখানেই যাই যেদিকে তাকাই
শুধু তুমি শুধু তুমি…”

ওদিকে গীতায় মহান আল্লাহতালায়া এরশাদ করেন–
‘যারা যেভাবে আমার ভজনা করে আমি তাকে সেই ভাবেই তুষ্ট করি।’
–গীতা ৪/১১
এই কথা শুনে সাধক রামকৃষ্ণ অনুধাবন করেন–যত মত তত পথ। অর্থাৎ যেমতে, যেপথেই আগান না কেন, সেমতে সেপথেই আল্লাহকে খুঁজে পাওয়া যায়। সকলে জানেন রামকৃষ্ণ মহাশয় সকল পথেই আল্লাহকে খুঁজছিলেন। শেষে কালীরূপে দেখা পান। উনার শিষ্য বিবেকানন্দ মহাশয়ও বলেছিলেন যে, আল্লাহর দেখা পেতে তিনি দরকার হলে মন্দির গীর্জা প্যাগোডা মসজিদ–সবখানেই যাবেন।

আর সত্যযুগের আল্লাভক্ত প্রহ্লাদের কথা তো জানেন। কাহিনী সংক্ষেপ–প্রহ্লাদের পিতা হিরণ্যকশিপুর জন্ম হয়েছিল দৈত্যকূলে। আল্লাহতালায় তার ভাইকে হত্যা করলে হিরণ্যকশিপু আল্লাহবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। কিন্তু তার ছেলে প্রহ্লাদ ছিলেন পরম আল্লাভক্ত। হিরণ্যকশিপুর আদেশে প্রহ্লাদ আল্লানাম ত্যাগ না করলে তাকে নানাভাবে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রত্যেকবার শুধু আল্লানাম জপ করার কারণে সে প্রাণে বেঁচে যায়। শেষে হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে জিজ্ঞেস করেন–তোর আল্লা কোথায় থাকে? আল্লাহর সাধনার দ্বিতীয় স্তরে থাকা প্রহ্লাদ বলেন, আল্লাহ সব সময় সব জায়গাতেই থাকেন। হিরণ্যকশিপু তখন একটি স্তম্ভ দেখিয়ে বলেন, তোর আল্লা কি এই মুহূর্তে এই স্তম্ভের মধ্যেও আছে? প্রহ্লাদ উত্তর দেন–অবশ্যই আছেন। এ কথা শুনে দৈত্যরাজ রাগ করে লাথি দিয়ে সেই স্তম্ভ ভেঙে ফেললে সেই স্তম্ভের ভেতর থেকে আল্লাহতালায় নরসিংহ মূর্তি ধারণ করে বেরিয়ে এসে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন।

এ তো গেলো আল্লাহর সাধনার দ্বিতীয় স্তর। প্রথম স্তরে কী হয়, জেনে নেয়া যাক–

সাধনার প্রথম স্তর–সাধারন ফানা ফিল্লাহর স্তরে সাধক পৌঁছলে আল্লাহর নাম শোনা মাত্রই কান্না করিতে থাকে।

নজরুলের রাধা এই প্রথমিক স্তরে এসে বলেন–
“সখি, সে হরি কেমন বল্‌।
নাম শুনে যা’র এত প্রেম জাগে
চোখে আনে এত জল।।”

আর চণ্ডীদাসের রাধা সখীদের শুধান–
“সই, কেবা শুনাইল শ্যাম-নাম।
কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো—
আকুল করিল মোর প্রাণ।”

তারপর–
“গুরুজন আগে দাঁড়াইতে নারি।
সদা ছল-ছল আঁখি।”–চণ্ডীদাস

“না জানি কতেক মধু, শ্যাম-নামে আছে গো—
বদন ছাড়িতে নাহি পারে!”
–চণ্ডীদাসের এই কথা শুনে লোক-সাহিত্যবিশারদ দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের যে অবস্থা হয়েছিল, “যত বার তাঁর নাম আবৃত্তি করিতেছি, তত বার সাংসারিক ক্লান্তি ও অবসাদ দূর হইয়া এক অলৌকিক পরমানন্দের আভাষ পাইতেছি, চক্ষু দুইটি অশ্রু-সিক্ত হইতেছে।”

প্রেমিক-প্রেমিকারাও প্রেম সাধনার এই পর্বে একে-অন্যের নাম স্মরণপূর্বক ছলছল নয়নে নাটক-সিনেমায় অনেক এক্টিং করে থাকে। আহা, মিস ইউ… মিস ইউ… মিস ইউ… আহা!

প্রথমে আল্লাহর নাম শুনে সাধকের মন-প্রাণ সিক্ত হয়। তারপর চোখ খুলে যেদিকে তাকায়, সেদিকেই আল্লাহর চেহারা ভাসে। আর সাধনার শেষ স্তর, অর্থাৎ যেখানে আল্লাহ প্রেমিক সাধক যখন সাধনা করতে করতে আরো একটি স্তর অতিক্রম করে তখন তাকে মোকাম্মেল ফানা ফিল্লাহ বলে। এ অবস্থায় সাধক নিজের চেহারাকে আল্লাহর চেহারার সাথে একাকার দেখতে পায়।

চণ্ডীদাসের রাধা এই শেষ স্তরে এসে বলেন,
“তোমারই গরবে গরবিনী হাম,
রূপসী তোমার রূপে”
–অর্থাৎ আমার যে রূপ, সেটা মূলত আল্লাহরই রূপ। দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন, “এই ছত্র কৃষ্ণের সঙ্গে রাধার তন্ময়ত্ব-জ্ঞাপক। তাঁহার রূপ, গুণ, সকলই কৃষ্ণ হইতে পাওয়া। অগ্নির সঙ্গে তাপের, চন্দ্রের সহিত জ্যোৎস্নার পরস্পরে যে অচ্ছেদ্য সম্পর্ক রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের তাহাই; রাধা কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি।”

নিজের মধ্যে ডুব দিলেই পরম ব্রহ্ম উরফে মহান আল্লাহতালাকে জানা যাবে, কিন্তু লালন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু নিজেকেই দেখে, তাইতো গুরু সিরাজ সাঁই লালনকে তিরস্কার করে বলেন–
“আপনাতে আপনি ফানা
হলে তারে যাবে জানা
সিরাজ শাহ কয়, লালন কানা
স্বরূপে রূপ দেখে সংক্ষেপে।।”
–লালনগীতি

আর বিখ্যাত গ্রীক সাধক সক্রেটিস নিজের মধ্যেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডসহ আল্লাহকে দেখতে পেয়ে শেষে “নিজেকে জানো” বাণী দিয়ে অমর হয়ে আছেন।

প্রেমিক-প্রেমিকারাও প্রেম সাধনার এই স্তরে এসে নিজেদের মধ্যেই অন্যজনকে দেখতে পায়। আর তখনই তারা মারামারি (হস্ত) শুরু করে দেয়।

ইতিহাস পাঠ–সাধক প্রবর ফার্সি কবি হযরত মানসুর হাল্লাজ (রহঃ) আল্লাহর সাধনার এই মোকাম্মেল ফানা ফিল্লাহ স্তরে পৌঁছেই আল্লাহর প্রেমে বিভোর হয়ে বলেছিলেন–“আনাল হক”, অর্থাৎ ‘আমিই আল্লাহ’। দুর্ভাগ্যবশত কবির ওই কথার রহস্য বুঝতে না পেরে শরীয়তের বিচারে তাকে হত্যা করা হয়। ব্যাকগ্রাউণ্ডে তখন বিজয় সরকারের গান বাজছিল–‘তুমি জানো না রে প্রিয়, তুমি মোর জীবনের সাধনা…’

One thought on “তুমি মোর জীবনের সাধনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *